আবুল বারকাত এফেয়ার
আবুল বারকাত এফেয়ার
রবিন খুদার ভারতে বিনিয়োগ, ইসলামী ব্যাংক বিতর্ক
জুলেখা সিরাপ থিঙ্ক ট্যাঙ্ক প্রতিবেদন
প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার সংকটের তিনটি অধ্যায়
বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে আজ একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া অস্ট্রেলিয়ান বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা যখন দীর্ঘমেয়াদে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনার জন্য ভারতকে বেছে নেন, তখন প্রশ্ন ওঠে, বাংলাদেশ কেন নয়?
এটি কেবল একজন বিনিয়োগকারীর সিদ্ধান্ত নয়; এটি বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রশ্ন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ ১৭ মাস রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে ছিলেন, বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য নতুন নেতৃত্ব, নতুন প্রতিশ্রুতি, নতুন ভাষ্য, সবকিছু থাকার পরও কেন একটি বড় আন্তর্জাতিক পুঁজি বাংলাদেশকে এড়িয়ে যায়?
বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়, প্রতিষ্ঠানের স্থায়িত্ব, নিয়ন্ত্রক কাঠামোর নিরপেক্ষতা, সম্পত্তির নিরাপত্তা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা দেখেন। আর এখানে ইসলামী ব্যাংক বিতর্ক নতুন গুরুত্ব পায়।
ড. আবুল বারকাত কে?
মুক্তিযোদ্ধা ড. আবুল বারকাত
বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতি, বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা ও রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা করেছেন।
তার সবচেয়ে আলোচিত ধারণাগুলোর একটি হলো "Economics of Fundamentalism" বা "মৌলবাদের অর্থনীতি"।
২০১৫ সালে প্রকাশিত তার গবেষণাপত্র The Political Economy of Fundamentalism and Fundamentalist Militancy in Bangladesh-এ তিনি যুক্তি দেন যে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তিকে কেবল রাজনৈতিক দল হিসেবে দেখলে ভুল হবে; বরং তাদের ঘিরে একটি অর্থনৈতিক অবকাঠামোও গড়ে উঠতে পারে।
বারকাতের মূল যুক্তি
বারকাতের গবেষণার কেন্দ্রীয় ধারণা ছিল যে কিছু ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তি ব্যাংক, বীমা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এনজিও, হাসপাতাল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মিডিয়া এবং সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে একটি সমান্তরাল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। তার মতে, এই নেটওয়ার্কের উদ্দেশ্য শুধু মুনাফা অর্জন নয়; সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি, মতাদর্শ বিস্তার এবং রাজনৈতিক প্রভাব সম্প্রসারণও এর অংশ।
তিনি ইসলামী ব্যাংককে এই বৃহত্তর অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তর বক্তব্য ছিল, কিছু অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে তাদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রেক্ষাপট থেকে আলাদা করে দেখা যায় না।
বারকাত দাবি করেছিলেন যে তিনি যে "মৌলবাদের অর্থনীতি" চিহ্নিত করছেন, তার বার্ষিক মুনাফা হাজার কোটি টাকার পর্যায়ে পৌঁছেছিল এবং ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা খাত ছিল এর অন্যতম প্রধান উৎস।
ইসলামী ব্যাংক: একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নাকি বৃহত্তর নেটওয়ার্ক?
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে তিনটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল:
বৃহৎ রেমিট্যান্স প্রবাহ
গ্রামীণ পর্যায়ে বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক
ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক ব্যাংকিং কার্যক্রম (যেমন RDS)
এই ব্যাংককে ঘিরে বিতর্ক কখনো শুধুমাত্র ব্যাংকিং সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ, পরিচালনা এবং প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নে রাজনৈতিক মাত্রা পেয়েছে।
ড. বারকাতের গবেষণায় বলা হয়, এই ধরনের ব্যাংকিং কাঠামো শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক সংগঠনের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণার সমালোচনা
বারকাতের গবেষণা নিয়ে উল্লেখযোগ্য সমালোচনাও রয়েছে।
সমালোচকদের বক্তব্য ছিল:
তিনি ধর্মভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক সংগঠনের সম্পর্ককে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছেন;
কিছু উপসংহার পর্যাপ্ত প্রমাণের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত;
একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মতাদর্শগত নৈকট্য থাকলেই সেটিকে রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ হিসেবে গণ্য করা যায় না;
তার কিছু হিসাব ও শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অর্থাৎ, বারকাতের গবেষণা সর্বজনস্বীকৃত সত্য নয়; কিন্তু এটিও সত্য যে তার উত্থাপিত প্রশ্নগুলো কখনও পুরোপুরি জনপরিসর থেকে হারিয়ে যায়নি।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বাংলাদেশে আবুল বারকাতের সমালোচনার মূল অংশ এসেছে জামাতে ইসলামি সংশ্লিষ্ট বুদ্ধিজীবিদের কাছ থেকে, জামাত-বান্ধব ফরহাদ মজহারের অনুসারীদের থেকে, জামাত-বান্ধব কথিত বামদের থেকে।
কেন জামাতের আগ্রহ, কেন বিতর্কে বারকাতের নাম
২০২৬ সালের সংসদীয় বিতর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইসলামী ব্যাংকের Rural Development Scheme (RDS) নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন।
স্বরাস্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের দাবি, এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিতরণ করা হয়েছে এবং নির্বাচনী রাজনীতির সঙ্গে এর সম্পর্ক তদন্ত করা প্রয়োজন। তিনি সংসদে অভিযোগ করেন যে RDS-এর মাধ্যমে মোট ২২,০০০ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে এবং এর একটি অংশ বিশেষ দলের নির্বাচনী উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে।
একই সঙ্গে তিনি ব্যাংকের শেয়ার মালিকানা, নিয়োগ, পদোন্নতি, ঋণ বিতরণ এবং অর্থপাচারের অভিযোগেরও তদন্ত দাবি করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মব করে এই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ দখলের অভিযোগও এনেছেন স্বরাস্ট্রমন্ত্রী।
একই অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নির্বাচনের সময় যে বিপুল পরিমাণ অর্থ নির্দিষ্ট দলের প্রার্থীদের কাছে এসেছে, সেটা পাবলিক নলেজ এবং এই প্রবাহ রাজনীতিকে নষ্ট করে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ইসলামি ব্যাঙ্কের ভেতরে এবং বাইরে একটা গোষ্ঠী উগ্রতা সৃষ্টি করে গ্রাহকের আস্থা নষ্ট করছে। বিরোধী জামাতের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, তারা ইসলামি ব্যাঙ্কের ভালো চান বলে তিনি বিশ্বাস করেন না। তিনি বলেন, জামাত চাচ্ছে ইসলামি ব্যাঙ্ক ফেল করুক, যাতে এখান থেকে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে তারা বলতে পারে, আর্থিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে।
বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির শফিকুর রহমান এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, RDS কোনো দলীয় কর্মসূচি নয়; এটি বিভিন্ন ধর্ম ও শ্রেণির মানুষের জন্য পরিচালিত একটি আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রকল্প। তিনি প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছেন, যদি একটি টাকাও দলীয় তহবিলে যাওয়ার প্রমাণ থাকে, তবে তা তদন্ত করা হোক।
দ্রস্টব্য যে জামাতের আমীর সরাসরি সংসদে উচ্চারণ করে বলেন, সরকারি দলের অভিযোগে তিনি ডক্টর বারকাতের ছায়া দেখতে পাচ্ছেন।
এস আলম পর্বের আগে ও পরে
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এস আলম গ্রুপের উত্থানের পর ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনা কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আসে। বর্তমানে ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ ঋণ, খেলাপি হিসাব এবং অর্থপাচার সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে তদন্ত চলছে।
রাজনৈতিক বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এস আলম গ্রুপের আগের মালিকানার কাঠামোতে কারা ছিলেন এবং তাদের ভূমিকা কি ছিল?
জামায়াতপন্থী মহল দাবি করে, এস আলমের আগমনের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের স্বাভাবিক ব্যবস্থাপনা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। তাই পূর্ববর্তী শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা উচিত।
অন্যদিকে সমালোচকদের যুক্তি হলো, যদি অতীতের মালিকানার সঙ্গে রাজনৈতিক সংগঠন বা তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের গভীর সম্পর্ক থেকে থাকে, তাহলে শুধু শেয়ার ফিরিয়ে দেওয়া নয়, বরং সেই সময়ের আর্থিক কর্মকাণ্ডও স্বচ্ছ তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
সংসদে আজ যে প্রশ্নগুলো উঠছে, এস আলম পর্বের আগে মালিকানা , অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এবং বিশেষ করে নির্বাচনকালীন RDS-এর অর্থ কোথায় গেলো, নিয়োগ-পদোন্নতির মাধ্যমে কারা প্রভাব বিস্তার করলো, ব্যাংকের অর্থ কি কোনো বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রকল্পকে সহায়তা করেছে, এসব প্রশ্নের অনেকগুলোর প্রতিধ্বনি ড. আবুল বারকাত এক দশকেরও বেশি আগে তুলেছিলেন।
এ কারণে বারকাতের গবেষণা সঠিক ছিল কি না, সেই বিতর্কের বাইরেও একটি বাস্তবতা সামনে এসেছে: তিনি যে প্রশ্নগুলো তুলেছিলেন, সেগুলো এখন আবার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনসভায় আলোচিত হচ্ছে।
প্রবাসী আয় ও ইসলামী ব্যাংকের গুরুত্ব
ইসলামী ব্যাংকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তিগুলোর একটি ছিল প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স। বহু বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা এই ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পাঠিয়েছেন।
সমালোচকদের একটি অংশের দাবি, এই বিশাল রেমিট্যান্স নেটওয়ার্কের ওপর প্রভাব বিস্তার ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জামাতের রাজনৈতিক আগ্রহের অন্যতম কারণ। অর্থনীতিবিদদের মতে, ইসলামী ব্যাংক দুর্বল হলেও রেমিট্যান্স প্রবাহ থেমে যাবে না; বরং অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকে স্থানান্তরিত হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার বিতর্ক
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে একাধিক বিতর্ক সামনে আসে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ প্রকাশিত হয় যে কিছু ক্ষেত্রে সংগঠিত চাপ, বিক্ষোভ বা জনসমাগম ব্যবহার করে প্রশাসনিক পরিবর্তন আনার চেষ্টা হয়েছে।
এসব অভিযোগের সঙ্গে জামায়াতের নাম জড়ানো হলেও বিষয়গুলো নিয়ে এখনো চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত বা সর্বসম্মত অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি। ফলে এগুলো রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে।
কারা ইসলামী ব্যাংকের প্রকৃত উত্তরাধিকারী?
আজকের বিতর্কে কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি আর শুধু এস আলম গ্রুপ নয়। প্রশ্ন হলো, এস আলমের আগে ব্যাংকের ওপর কার প্রভাব ছিল, সেই প্রভাবের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ফলাফল কী ছিল, এবং ভবিষ্যতে ব্যাংকটি কার হাতে পরিচালিত হবে।
ড. আবুল বারকাতের বহু পুরোনো অভিযোগ, বর্তমান সরকারের মন্ত্রীদের বক্তব্য এবং জামায়াতের পাল্টা দাবি, সব মিলিয়ে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন রূপে ফিরে এসেছে।
চূড়ান্ত সত্য নির্ধারণের জন্য রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, প্রয়োজন স্বাধীন ফরেনসিক অডিট, স্বচ্ছ তদন্ত এবং আদালতে যাচাইযোগ্য প্রমাণ। কারণ ইসলামী ব্যাংক কেবল একটি ব্যাংক নয়; এটি কোটি গ্রাহক, লক্ষ প্রবাসী এবং দেশের আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান।
ড. আবুল বারকাতের কারাভোগ এবং বুদ্ধিজীবী মহলের নীরবতা
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ড. বারকাত নিজেও আইনি জটিলতার মুখোমুখি হন। তার গ্রেপ্তার, জামিন না মঞ্জুর এবং পুনরায় বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে পড়া নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
সমর্থকদের মতে এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ, অন্যদিকে সমালোচকেরা বলেন যে আইনগত প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক রঙ দেওয়া হচ্ছে।
ড. আবুল বারকাতকে ঘিরে বিতর্কের একটি কম আলোচিত দিক হলো বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষক সমাজের প্রতিক্রিয়া।
বাংলাদেশে যখন কোনো শিক্ষক, গবেষক বা জনবুদ্ধিজীবী রাজনৈতিক চাপে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, তখন বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, নাগরিক সমাজ ও পেশাজীবী সংগঠনগুলো বিবৃতি দিয়েছে। কিন্তু ড. বারকাতের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়াতে রাজনৈতিক বিভক্তি দেখা গেছে। এখানে একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন সামনে আসে।
ড. বারকাত শুধু একজন অর্থনীতিবিদ নন; তিনি বহু বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতি, সাম্প্রদায়িক অর্থনীতি, ভূমি বঞ্চনা এবং ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার গবেষণার সঙ্গে একমত হওয়া বাধ্যতামূলক নয়, কিন্তু তিনি নিঃসন্দেহে দেশের অন্যতম আলোচিত অর্থনীতিবিদ।
তাহলে তার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আইনি পদক্ষেপের সময় দেশের প্রভাবশালী অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ কেন দৃশ্যমানভাবে সোচ্চার হননি?
সমালোচকেরা বিশেষভাবে ড. আনু মুহাম্মদের মতো পরিচিত অর্থনীতিবিদদের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। তাদের প্রশ্ন, করপোরেট স্বার্থ, জ্বালানি নীতি, বৈদেশিক প্রভাব বা অর্থনৈতিক বৈষম্যের মতো বিষয়ে যারা ধারাবাহিকভাবে কথা বলেন, তারা ড. বারকাতের প্রশ্নে কেন অপেক্ষাকৃত কম দৃশ্যমান?
আরও বড় প্রশ্ন হলো ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা। ড. ইউনূস নিজেও একজন বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ। তার নেতৃত্বে পরিচালিত রাষ্ট্রযন্ত্রের সময়ে ড. বারকাতের বিরুদ্ধে মামলাগুলো অগ্রসর হওয়ায় সমালোচকেরা জানতে চান, রাষ্ট্র কি একই মাত্রার আগ্রহ নিয়ে ইসলামী ব্যাংকের অতীত মালিকানা কাঠামো, পরিচালনা ব্যবস্থা, ঋণ অনুমোদন, RDS কার্যক্রম এবং ঐতিহাসিক অভিযোগগুলোও খতিয়ে দেখছে?
এই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক নয়; প্রাতিষ্ঠানিক। আইনের শাসনের প্রকৃত পরীক্ষা হয় তখনই, যখন রাষ্ট্র ব্যক্তি নয়, নীতি অনুসরণ করে; এবং যখন তদন্ত ব্যক্তি-নির্ভর নয়, প্রতিষ্ঠান-নির্ভর হয়।
এই কারণে ড. বারকাতের কারাভোগ এবং ইসলামী ব্যাংক বিতর্ককে অনেক বিশ্লেষক একই বৃহত্তর প্রশ্নের অংশ হিসেবে দেখেন: বাংলাদেশ কি তার আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসের সব অধ্যায় সমানভাবে পর্যালোচনা করতে প্রস্তুত?
তিনটি ঘটনা, একটি কাঠামোগত বাস্তবতা
পুরো আলোচনাকে তিনটি আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না। এগুলো একটি কাঠামোগত বাস্তবতার তিনটি দিক।
রবিন খুদার বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত দেখায় প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ।
ড. আবুল বারকাতের গবেষণা দেখায় অর্থনৈতিক কাঠামো ও রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যকার সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে একাডেমিক বিতর্ক।
ইসলামী ব্যাংক বিতর্ক দেখায় রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস ও স্বচ্ছতা নিয়ে চলমান দ্বন্দ্ব।
উপসংহার: প্রশ্নের অবসান নয়, প্রশ্নের গুরুত্ব
তিনটি ক্ষেত্রের মিলিত বাস্তবতা একটি বিষয় স্পষ্ট করে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ কেবল প্রবৃদ্ধির সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হবে না, বরং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা, ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা এবং নীতির পূর্বানুমানযোগ্যতার ওপর নির্ভর করবে।
ড. আবুল বারকাতের গবেষণা, ইসলামী ব্যাংক বিতর্ক এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত, সব মিলিয়ে একটি বৃহত্তর বাস্তবতা তৈরি করে। সেই বাস্তবতা হলো, প্রতিষ্ঠান যতক্ষণ পর্যন্ত স্বচ্ছভাবে বোঝা এবং মূল্যায়ন করা না হবে, ততক্ষণ আস্থার সংকট পুরোপুরি দূর হবে না।
জুলেখা সিরাপ থিঙ্ক ট্যাঙ্ক প্রতিবেদন
গবেষনা : তৃণা রাব্বানি, সিবিল মির্জা
প্রতিবেদক : শাহদাত মুনশি, নওরোজ দৌলা
উপদেষ্টা : চয়ন খায়রুল হাবিব
Comments
Post a Comment